জসীমউদ্দীন এর কবিতা


 


সুখের বাসর - জসীমউদ্দীন

নয়া জমিদার আদিলদ্দীন ধরি সকিনারে হাত,
কহিল, চল গো সোনার বরণী, মোর ঘরে মোর সাথ!
মালার মতন করিয়া তোমারে পরিয়া রাখিব গলে,
পঙ্খী করিয়া পুষিব তোমারে উড়াব আকাশ ভরি,
আমার দুনিয়া রঙিন করিব তোমারে মেহেদী করি।

সকিনা কহিল, আপনি মহান, হতভাগিনীর তরে,
যাহা করেছেন জিন্দেগী যাবে ঋণ পরিশোধ করে।
তবুও আমারে ক্ষমা করিবেন, আপনার ঘরে গেলে,
বসিতে হইবে হতভাগিনীরে কলঙ্ক কালি মেলে।
আসমান সম আপনার কুল, মোর জীবনের মেঘে,
যত চান আর সুরুয তারকা সকল ফেলিবে ঢেকে।
ধোপ কাপড়েতে দাগ লাগিলে যে সে দাগ মোছেনা আর,
অভাগীর তরী ভাসাইতে দিন ভুলের গাঙের পার।

আদিল কহিল, সুন্দর মেয়ে! থাক চাঁদ মেঘে ঢেকে,
তুমি যে উদয় হও মোর মনে জোছনা ঝলক এঁকে।
মোর ভালবাসা চান্দের সম, তব কলঙ্ক তার,
শোভা হয়ে শুধু ছড়ায়ে পড়িবে নানা কাহিনীতে আর।
সকিনা কহিল, পাড়ে পড়ি তুমি আমারে বুঝোনা ভুল,
কত না বিপদ সায়র হইতে তুমি মোরে দেছ কূল।
তোমার নিকটে জমা রাখিলাম ইহ-পরকাল মোর,
দন্ডের তরে তোমারে ভুলিলে আমি যেন লই গোর।
তোমার লাগিয়া আমি যে বন্ধু তাপসিনী হয়ে রব,
গহন বনেতে কুঁড়ে ঘরে বসি তব নাম শুধু লব।
ক্ষমা করো মোরে, তোমার জীবনে দোসর হইব বলে,
সাধ থাকিলেও সাধ্য নাহিক আমারি ভাগ্য ফলে।

আদিল কহিল, সুন্দর মেয়ে! তুমি কেন ভয় পাও?
আমার আকাশে তুমি হবে মোর উদয়-তারার নাও।
এই বুক মোর এত প্রসারিত, তাহার আড়াল দিয়া,
দুনিয়া ছড়ান তব কলঙ্ক রাখিব যে আবরিয়া।
এ বাহুতে আছে এত বিক্রম, তার মহা-মহিমায়,
এতটুকু গ্লানি আনিতে পাবে না কেউ এ জীবনটায়।

তবু মোরে ক্ষমা করিও বন্ধু! সকিনা কহিল কাঁদি,
যারে ভালবাসি তারে কোন প্রাণে দেব এই দেহ সাধি।
একটি বিপদ হতে উদ্ধার পাইবার লাগি তার,
আরটি বিপদে পড়িতে হয়েছে বদলে এ দেহটার
পন্যের মত দেহটারে সে যে বিলায়েছে জনে জনে,
কোন লালসার লাগি নহে শুধু বাঁচিবার প্রয়োজনে।
এই মন লয়ে কতজন সনে করিয়াছে অভিনয়,
কত মিথ্যার নকল রচিয়া ফিরেছে ভুবনময়।
সে শুধু ক্ষুধার আহারের লাগি কে তাহা বুঝিতে পাবে?
সবাই তাহারে চিন্তা করিবে নানা কুৎসিতভাবে!
সেই মন আর সেই দেহ যাহা সবখানে কদাকার,
কেমন করিয়া দিবে তারে যেবা সব চেয়ে আপনার!
পায়ে পড়ি তব, শোন গো বন্ধু! ছাড় অভাগীর আশা,
আমারে লইয়া ভাঙিওনা তব আসমান সব বাসা।

আদিল কহিল, বুঝিলাম মেয়ে! রজনী হইলে শেষ,
রাতের বাসারে উপহাসি পাখি চলে যায় আর দেশ;
সকল বিপদ হইতে তোমারে করিয়াছি উদ্ধার,
আমারে লইয়া তোমার জীবনে প্রয়োজন কিবা আর?
কি কথা শুনালে পরাণ বন্ধু! সকিনা কাঁদিয়া কয়,
তীক্ষ্ম বরশা-শেল যে বিধালে আমার জীবনটায়।
এত যদি মনে ছিল গো বন্ধু, এই অভাগিনী তরে,
তোমার পরাণ ওমন করিয়া এমনই যদি বা করে;
আমারে লইয়া এতই তোমার হয় যদি প্রয়োজন,
আজি হতে তবে সঁপিলাম পায়ে এই দেহ আর মন।
সাক্ষী থাকিও আল্লা রসুল! আপন অনিচ্ছায়,
সব চেয়ে যেবা পবিত্র মম তারে দিনু আমি হায়;
এই দেহ মন যাহা জনে জনে কালি যে মাকায়ে গেছে,
তাই নিল আজি মোর ফেরেস্তা আপনার হাতে যেচে।
বনে থাকো তুমি পউখ পাখালী আমারে করিও দোয়া,
আজ হতে আমি বন্দী হইনু লইয়া ইহার ময়া।
অনেক ঊর্ধ্বে থাকগো তোমরা চন্দ্র-সূরুয দুটি,
মোদের জীবন রহে যেন সদা তোমাদের মত ফুটি।
দোয়া কর তুমি সোনার পতিগো, দোয়া কর তুমি মোরে,
তোমার জীবনে জড়ালাম আমি লতার মতন করে।
এ লতা বাঁধন জনমের মত কখনো যেন না টুটে,
যত ভালবাসা ফুলের মতন রহে যেন এতে ফুটে।

সকিনারে লয়ে আদিল এবার পাতিল সুখের ঘর,
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর।
সোঁতের শেহলা ভাসিতে ভাসিতে এবার পাইল কূল,
আদিলবলিল, গাঙের পানিতে কুড়ায়ে পেঁয়েছি ফুল।
এই ফুল আমি মালায় গাঁথিয়া গলায় পরিয়া নেব,
এই ফুল আমি আতর করিয়া বাতাসে ছড়ায়ে দেব
এই ফুলে আমি লিখন লিখিব, ভালবাসা দুটি কথা,
এই ফুলে আমি হাসিখুশি করে জড়াব জীবন-লতা।

করিলও তাই, সকিনারে দিয়ে রঙের রঙের শাড়ী,
আদিল কহিল, সবগুলি মেঘ এসেছে সন্ধ্যা ছাড়ি।
সবগুলি পাখি রঙিন পাখায় করেছে হেথায় মেলা,
সবগুলি রামধনু এসে দেহে জুড়েছে রঙের খেলা।
ঝলমল মল গয়নায় গাও ঝলমল মল করে,
ঝিকিমিকি ঝিকি জোনাক মতিরা হাসিছে অঙ্গ ধরে।
……………………………………………..


বিসর্জন - জসীমউদ্দীন

কি করে আদিল সময় কাটাবে? নানা সন্দেহ ভার,
দহন বিষের তীর বিঁধাইয়া হানিতেছে প্রাণে তার।
সে যেন দেখিছে আকাশ বাতাস সবাই যুক্তি করি,
সকিনারে তার পঙ্কিল পথে নিয়ে যায় হাত ধরি।
যারে দেখে তারে সন্দেহ হয়, পাড়া প্রতিবেশী জন,
সকিনার সাথে কথা কহিলেই শিহরায় তার মন।
ঘরের বাহির হইতে সে নারে; পলকে আড়াল হলে,
এই পাপিয়সী আবার ডুবিবে পঙ্কিল হলাহলে।
হাতে লয়ে ছোরা চোরের মতন বাড়ির চারিটি ধারে,
ঘুরে সে বেড়ায় যদি বা কাহারে ধরিতে কখন পারে।
আহার-নিদ্রা ছাড়িল আদিল, ঘুম নাই তার রাতে,
কোথাও একটু শব্দ হইলে ছোটে বাতাসের সাথে।

সকিনার সেই সোনা দেহখানি সরষে ক্ষেতের মত,
রঙে রঙে লয়ে তাহার পরাণে কাহিনী আনিত কত।
সেই দেহে আজ কোন মোহ নাই, বাসর রাতের শেষে
নিঃশেষিত যে পানের পাত্র পড়ে আছে দীন বেশে।
যে কন্ঠস্বরে বীনাবেনু রব জাগাত তাহার প্রাণে,
মাধুরী লুপ্ত সে স্বর এখন তীব্র আঘাত হানে।
মোহহীন আর মধুরতাহীন দেহের কাঠাম ভরে,
বিগত দিনের কঠোর কাহিনী বাজিয়ে তীব্র স্বরে।
কোন মোহে তবে ইহারে লইয়া কাটিবে তাহার দিন,
চিরতরে তবে মুছে যাক এই কুলটার সব চিন।

গহন রাত্রে ঘুমায় সকিনা শিয়রের কাছে তার,
হাঁটু গাড়া দিয়া বসিল আদিল হাত দুটি করি বার;
খোদার নিকটে পঞ্চ রেকাত নামাজ আদায় করি,
সাত বার সে যে মনে মনে নিল দরুদ সালাম পড়ি।
রুমালে জড়ায়ে কি ওষুধ যেন ধরিল নাকের পরে,
বহুখন ভরি নিশ্বাস তার দেখিল পরখ করে।
তারপর সে যে অতীব নীরবে হাত দুটি সকিনার,
বাঁধিল দড়িতে চরণ দুইটি পরেতে বাঁধিল তার।
সন্তর্পণে দেহখানি তার তুলিয়া কাঁধের পরে,
চলিল আদিল নীরব নিঝুম গাঁর পথখানি ধরে।

সুদূরে কোথায় ভুতুমের ডাকে কাঁপিয়া উঠিছে রাত,
ঘন পাট ক্ষেতে কোঁড়া আর কুঁড়ী করিছে আর্তনাদ।
নিজেরি পায়ের শব্দ শুনিয়া প্রাণ তার শিহরায়,
নিজ ছায়া যেন ছুল ধরে কার সাথে সাথে তার ধায়।
বাঘার ভিটার ডনপাশ দিয়ে, ঘন আমবন শেষে,
আঁকাবাঁকা পথ ঘুরিয়া ঘুরিয়া নদীর ঘাটেতে মেশে।
সেইখানে বাঁধা ডিঙ্গি তরনী, তার পাটাতন পরে,
সকিনারে আনি শোয়াইয়া দিল অতি সযতনে ধরে।

সামনে অথই পদ্মার নদী প্রসারিয়া জলধার,
মৃদু ঢেউ সনে ফিসফিস কথা কহিতেছে পারাপার।
সকল ধরনী স্তব্ধ নিঝুম জোছনা কাফন পরি,
কোন সে করুণ মরণের বেশে সাজিয়াছে বিভাবরী।
ধীরে নাও খুলি ভাসিল আদিল অথই নদীর পরে,
পশ্চাতে ঢেউ বৈঠার ঘায়ে কাঁদে হায় হায় করে।
রহিয়া রহিয়া চরের বিহগ চিৎকারি ওঠে ডেকে,
চারি দিগন্ত কেঁপে কেঁপে ওঠে তাহার ধাক্কা লেগে।

সুদূরের চরে ভিড়াল তরনী, ঘন কাশবনে পশি,
নল খাগড়ায় আঘাত পাইয়া উঠিতেছে জল স্বসি।
মাছগুলি দ্রুত ছুটিয়া পালায় গভীর জলের ছায়।
আবার আদিল পঞ্চ রেকাত নফল নামাজ পড়ি,
খোদার নিকট করে মোনাজাত দুই হাত জোড় করি।
উতল বাতাস কাশবনে পশি আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদে,
রাতেরে করিছে খন্ডিত কোন বিরহী পাখির নাদে।
ডিঙ্গার তলে পদ্মার পানি দাপায়ে দাপায়ে ধায়,
সুদূরের চরে রাতের উক্লা আগুন জ্বালায়ে যায়।

না-না তবু এরে মরিতে হইবে! বাঁধিয়া কলসীখানি,
সকিনার গলে, আদিল তাহারে পার্শ্বে আনিল টানি!
শব্দ করিয়া হঠাৎ নায়ের বৈঠা পড়িল জলে,
জাগিয়া সকিনা চারিদিকে চায় কোথা সে এসেছে চলে!
স্বামীরে শুধায়, এ আমি কোথায়, এমন করিয়া চেয়ে
কেন আছ তুমি? কন্ঠের স্বরে স্তব্ধতা ওঠে গেয়ে।
না! না! এযে মায়া, কভু আদিলেরে ভুলাতে পাবে না আর,
কেহ নাই কোথা টলাতে পারে প্রতিজ্ঞা হতে তার্
কর্কশ স্বরে কহে সকিারে, অকে চিন্তা করে,
স্থির জানিয়াছি, নাহি অধিকার তোমার বাঁচার তরে।

সকিনা কহিল, সোনার পতিরে! এত যদি তব দয়আ,
তবে কেন এই অভাগীরে লবে পাতিলে সুখের ময়া।
সোঁতের শেহলা ভেসে ফিরিতাম আপন সোঁতের মুখে,
কেন তারে তবে কুড়ায়ে আনিয়া আশ্রয় দিলে বুকে!
আমি ত তোমারে কত বলেছিনু, এ বুকে আগুন ভরা,
যে আসে নিকটে তারে দেহ শুধু ইহারি দারুণ পোড়া।
আশ্রয় নিতে গেলাম যে আমি বট বৃক্ষের ছায়ে,
পাতা যে তাহার ঝরিয়া পড়িল মোর নিম্বাস ঘায়ে।
এ কথা ত পতি, কত বলেছিনু তবে কেন হায় হায়,
এ অভাগিনীরে জড়াইলে তব বুক-ভরা মমতায়!
আমারে লইয়া বক্ষের মাঝে লিখেছিলে যত কথা,
সে কথায় যে গো ফুল ফুটায়েছি রচিয়া সুঠাম লতা;
সে লতারে আমি কি করিব আজ! গৃহহীন অভাগীরে,
কেন ঘর দিলে স্নেহছায়া ভরা তোমার বুকের নীড়ে?
আদিল কহিল, ভুল করেছিনু, ভেবেছিনু এই বুকে
এত মায়া আছে তা দিয়ে স্বর্গ গড়িব সোনার সুখে।
আজি হেরিলাম, আমার স্বর্গে হাবিয়া দোজখ জ্বলে,
তোমার বিগত জীবন বাহিনী তার বহ্নির দোলে।
ভাবিয়াছিলাম, এ বাহুতে আছে এত প্রসারিত মায়া,
ঢাকিয়া রাখিব তব জীবনের যত কলঙ্ক-ছায়া।
আজি হেরিলাম, সে পাপ-বহ্নি বাহুর ছায়ারে ছিঁড়ে,
দিকে দিগনে- দাহন ছড়ায় সপ্ত আকাশ ঘিরে।
এই বোধ হতে নিস্তার পেতে সাধ্য নাহিক আর,
আমার আকাশ বাতাসে আজিকে জ্বলিতেছে হাহাকার।
সেই হাহাকারে, তোমার জীবন ইন্ধন দিয়ে আজ,
মিটাইব সাধ, দেখি যদি কমে সে কালি-দহের ঝাঁজ।

সকিনা কহিল, পতি গো! তুমি যে আমারে মারিবে হায়,
হাসিমুখে আমি সে মরণ নিব জড়ায়ে আঁচল ছায়।
আমি যে অভাগী এ বুকে ধরেছি তোমার বংশধর,
তার কিবা হবে, একবার তুমি কও মোরে সে খবর?

থাপড়িয়া বুক আদিল কহিল, ওরে পাপীয়সী নারী,
আর কি আঘাত আছে তোর তূণে দিবি মো পানে ছাড়ি!
আর কি সাপের আছে দংশন, আছে কি অগ্নি জ্বালা,
আর কি তীক্ষ্ম কন্টক দিয়ে গড়েছিস তুই মালা!
মোর সন্তান আছে তোর বুকে হায়, হায়, ওরে হায়,
বড় হলে তারে জানিতে হইবে, কুলটা তাহার মায়।
তোর জীবনের যত ইতিহাস দহন সাপের মত,
জড়ায়ে জড়ায়ে সেই সন্তানে করিবে নিতুই ক্ষত।
পথ দিয়ে যেত কহিবে সকলে আঙুলে দেখায়ে তায়,
চেয়ে দেখ তোরা, নষ্টা মায়ের সন্তান ওই যায়!
আপন সে ছেলে শত ধিক্কার দিবে নাকি তার বাপে,
গলবন্ধনে মরিবে না হায়, সে অপমানের তাপে?
তার চেয়ে ভাল, ওরে কলঙ্কী! ভেসে-র সেই ফুল,
তোর সনে যেয়ে লভুক আজিকে চির জনমের ভুল।
ক্ষণেক থামিয়া রহিল আগিল, সারাটি অঙ্গে তার,
কোন অদম্য হিংসা পশু যে নড়িতেছে অনিবার।
জাহান্নামের লেলিহা বহ্নি অঙ্গভূষণ করে,
উন্মাদিনী কে টানিছে তাহারে, অধরে রুধির ঝরে।
না! না! না! সে ফুল চির নিষ্পাপ, হাঁকিয়া সে পুন কয়,
ওরে কলঙ্কী!তোর সনে তার এক ঠাই কভু নয়।
নল খাগড়ার ওই পথ দিয়ে খানিক এগিয়ে গেলে,
ঘন পাট ক্ষেত, ওই ধারে গেলে চরের গেরাম মেলে!
সেই পথ দিয়ে যতদূর খুশী হাটিয়া যাইবি পায়,
মোর পরিচিত কেউ যেন কভু তোরে না খুঁজিয়া পায়।

নীরবে সকিনা আদিলের পায়ে একটি সালাম রাখি,
নল খাগড়ার ঘন জঙ্গলে নিজেরে ফেলিল ঢাকি।
আদিলের তরী কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মানদীর গায়,
সবল হাতের বৈঠার ঘায়ে কাঁদে ঢেউ হায় হায়।
……………………………………………..


বিদায় - জসীমউদ্দীন

কিছুদিন বাদে আদিল কহিল, গান ত হইল শেষ,
সোনার বরণী সকিনা আমার চল আজ নিজ দেশ।
তোমার জীবনে আমার জীবনে দুখের কাহিনী যত,
শাখায় লতায় বিস্তার লভি এখন হয়েছে গত।
চল, ফিরে যাই আপনার ঘরে শূন্য শয্যা তথা,
শুষ্ক ফুলেরা ছাড়িছে নিশ্বাস স্মরিয়া তোমার কথা।

শুনিয়া সকিনা ফ্যাল ফ্যাল করি চাহিল স্বামীর পাানে,
সে যেন আরেক দেশের মানুষ বোঝে না ইহার মানে।
আদিল কহিলসেথায় তোমার হলুদের পাটাখানি,
সে শুভ দিনের রঙ মেখে গায় ডাকিছে তোমারে রাণী,
উদাস বাতাস প্রবেশ করিয়া শূূনো কলসীর বুকে,
তোমার জন্যে কাঁদিছে কন্যে শত বিরহের দুখে
মাটির চুলা যে দুরন্ত বায়ে উড়ায়ে ভস্মরাশ,
ফাটলে ফাটরে চৌচির হয়ে ছাড়িছে বিরহ শ্বাস।
কন্যা-সাজানী সীমলতা সেথা রোপেছিলে নিজ হাতে।
রৌদ্রে-দাহনে মলিন আজিকে কেবা জল দিবে তাতে।
চল, ফিরে যাই আপনার ঘরে, সেথায় সুখের মায়া।
পাখির কুজনে ঝুমিছে সদাই গাছের শীতল ছায়া।

ক্ষণেক নীরব রহিয়া সকিনা শুধাল স্বামীরে তার,
কোথা সেই ঘর আশ্রয়-ছায়া মিলিবে জীবনে আর ?
অভাগিনী আমি প্রতি তিলে তিলে নিজেরে করিয়া দান,
কত না দুঃখের দাহনে কিরনু সে ঘরের সন্ধান।
সে ঘর আমার জনমের মত পুড়িয়া হয়েছে ছাই,
আমার সমুখে শুষ্ক মরু যে ছাড়ে আগুনের হাই।

আদিল কহিল, সে মরুতে আজি বহিছে মেঘের ধারা,
তুমি সেথা চল নকসা করিয়া রচিবে তৃণের চারা।
সেথা অনাগত শিশু কাকলীর ফুটিবে মধুর বোল,
নাচিবে দখিন বসন্ত বায় দোলায়ে সুখের দোল।

মিথ্যা লইয়া কতকাল পতি প্রবোধিব আপনায় ?
ম্লান হাসি হেসে শুধায় সকিনা, দুঃখের দাহনায়
অনেক সহিয়া শিখেছি বন্ধু, মিছার বেসাতি করি,
ভবের নদীতে ফিরিছে কতই ভাগ্যবানের তরী।
সেথায় আমার হলনাক ঠাঁই, দুঃখ নাহি যে তায়,
সান্ত্বনা রবে, অসত্য লয়ে ঠকাইনি আপনায়।
কোন ঘরে মোরে নিয়ে যাবে পতি?যেথায় সমাজনীতি,
প্রতি তিলে তিলে শাসনে পিষিয়া মরিছে জীবন নিতি।
না ফুটিতে যেথা প্রেমের কুসুম মরিছে নিদাঘ দাহে,
না ফুটিতে কথা অধরে শুকায় বিভেদের কাঁটা রাহে।
সাদ্দাদ সেথা নকল ভেস্ত গড়িয়া মোহের জালে,
দম্ভে ফিরেছে টানিছে ছিঁড়িছে আজিকার এই কালে।
সে দেশের মোহ হইতে যে আজি মুক্ত হয়েছি আমি,
স্বার্থক যেন লাগিছে যে দুখ সয়েছি জীবনে, স্বামী।
কোন ঘরে তুমি নিয়ে যাবে পতি, কুলটার দুর্নাম,
যেথায় জ্বলিছে শত শিখা মেলি অফুরান অবিরাম।
যেথায় আমার অপাপ-বিদ্ধ শিশু সন্তান তরে,
দিনে দিনে শুধু রচে অপমান নানান কাহিনী করে।
যেথায় থাপড়ে নিবিছে নিমেষে বাসরের শুভ বাতি.
মিলন মালিকা শুকায় যেখানে শেষ না হইতে রাতি।
যেথায় মিথ্যা সম্মান অর খ্যাতি আর কুলমান,
প্রেম-ভালবাসা স্নেহ-মায়া পরে হানিছে বিষের বাণ।
সেথায় আমার ঘর কোথা পতি ? মোরে ছায়া দিতে হায়,
নাই হেন ঠাঁই রীতি নীতি ঘেরা তোমাদের দুনিয়ায়।
এ জীবনে আমি ঘরই চেয়েছিনু সে ঘরের মোহ দিয়ে,
কেউ নিল হাসি, কেউ নিল দেহ কেউ গেল মন নিয়ে।
ঘর ত কেহই দিল না আমারে, মিথ্যা ছলনাজাল,
পাতিয়া জীবনে নিজেরে ভুলায়ে রাখি আর কতকাল।

আদিল কহিল, আমিও জীবনে অনেক দুঃখ সয়ে,
নতুন অর্থ খুঁজিয়া পেয়েছি তোমার কাহিনী লয়ে।
আর কোন খ্যাতি, কোন গৌরব, কোন যশ কুলমান,
আমাদের মাঝে আনিতে নারিবে এতটুকু ব্যবধান।
বিরহ দাহনে যশ কুলমান পোড়ায় করেছি ছাই,
তোমার জীবন স্বর্ণ হইয়া উজলিছে সেথা তাই।
চল ঘরে যাই, নতুন করিয়া গড়িব সমাজনীতি,
আমাদের ভালবাসী দিয়ে সেথা রচিব নতুন প্রীতি,

সে ঘর বন্ধু, এখনো রচিত হয় নাই কোনখানে,
সে প্রীতি ফুটিবে আমারি মতন কোটি কোটি প্রাণদানে।
তুমি ফিরে যাও আপনার ঘরে, রহিও প্রতীক্ষায়.
হয়ত জীবনে আবার মিলন হইবে তোমা-আমায়।

কারে সাথে করে ফিরে যাব ঘরে ? শূন্য বাতাস তথা,
ফুঁদিয়ে এ বুকে আগুন জ্বালাবে ইন্ধনি মোর ব্যথা।
একা কেন যাবে ?সকিনা যে কহে, এই যে তোমার ছেলে,
এরে সাথে করে লইও সেথায় নতুন জীবন মেলে।
দিনে দিনে তারে ভুলে যেতে দিও জনম দুখিনী মায়,
শিখাইও তারে, মরিয়াছে মাতা জীবনের ঝোড়ো বায়।
কহিও, দারুণ বনের বাঘে যে খায়নি তাহারে ধরে,
মনের বাঘের দংশনে সে যে মরিয়াছে পথে পড়ে
এতদিন পতি, তোমার আশায় ছিনু আমি পথ চেয়ে,
আঁচলের ধন সঁপিলাম পায় আজিকে তোমারে পেয়ে।
কতেকদিন সে কাঁদিবে হয়ত অভাগী মায়ের তবে,
সে কাঁদব তুমি সহ্য করিও আর এক শুভ স্মরে।
মোর জীবনের বিগত কাহিনী মোর সাথে সাথে ধায়,
তাহারা আঘাত হানিবে না সেই অপাপ জীনটায়।
বড় আদরের মোর তোতামণি তারে যাও সাথে নিয়ে,
আমারি মতন পালিও তাহারে বুকের আদর দিয়ে।
এই কথা বলি অভাগী সকিনা ছেলেরে স্বামীর হাতে,
সঁপিয়া যে দিতে নয়নের জল লুকাইল নিরালাতে।

তোতামণি কয়, মাগো, মা আমার লক্ষী আমার মা,
তোমারে ছাড়িয়া কোথাও যে মোর পরাণ টিকিবে না।
কোন বনবাসে আমারে মা তুমি আজিকে সঁপিয়া দিয়া,
কি করিয়া তুমি জীবন কাটাবে একেলা পরাণ নিয়া।
বাছারে! সে সব শুধাসনে মোরে, এটুকু জানিস সার,
ছেলের শুভের লাগিয়া সহিতে বহু দুখ হয় মার।
রজনী প্রভাতে মা বোল বলিয়া আর না জুড়াবি বুক,
শতেক দুখের দাহন জুড়াতে হেরিব না চাঁদ মুখ।
তবু বাছা তোরে ছাড়িতে হইবে, জনম দুখিনী মার,
সাধ্য হল না বক্ষে রাখিতে আপন ছেলেরে তার

ছেলেরে আঁচলে জড়ায়ে সকিনা কাঁদিল অনেকক্ষণ,
তারপর কোন দৃঢতায় যেন বাঁধিয়া লইল মন।
উসাদ কন্ঠে কহিল স্বামীকে, ফিরে যাও, নিজ ঘরে,
মোদের মিলন বাহিরে হল না রহিল হৃদয় ভরে।
আমার লাগিয়া উদাসী হইয়া ফিরিয়াছ গাঁয় গাঁয়,
এই সান্ত্বনা রহিল আমার সমুখ জীবনটায়।
যাহার লাগিয়া এমন করিয়া অমন পরাণ করে,
আজি জানিলাম, তাহারো পরাণ আমারো লাগিয়া ঝরে।
এ সুখ আমার দুখ-জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার,
সারাটি জনম তপস্যা করি শোধ নাহি হবে তার।
এই স্মরণের শক্তি আমারে চালাবে সমুখ পানে,
যে অজানা সুর মোহ বিস্তারি নিশিদিন মোর টানে।

প্রাণের সকিনা ? আদিল শুধায়, সে তব জীবনটায়,
আমার তরেতে এতটুকু ঠাই নাহি কোন তরুছায় ?
আছে, আছে পতি, সকিনা যে কহে, হায়রে যাহারে পাই,
তাহারে আবার হারাইতে সখা, বড় যে আরাম তাই।
ফুলেরে ডাকিয়া পুছিনু সেদিন, ফুল ! তুমি বল কার ?
ফুলে কহে, যারে কিছু না দিলাম আমি যে সবটা তার।
শুধালাম পুন; বল বল ফুল ! ব তুমি দিলে যারে,
সেকি আজ হাসে বরণে সুবাসে তোমার দানের ভাবে ?
সে আমার কাছে কিছু পায় নাই। ফুল কহে ম্লান হাসি,
পদ্মের বনে ফিরিছে সারসী কুড়ায়ে শামুক রাশি।
পুছিলাম পুন ফুল !তুমি বল কোথায় সবতি তব ?
ফুল কহে, যারে কিছু দেই নাই সেথা মোর চিরভব।
এ জীবনে মোর এই অভিশাপ যারে কিছু দিতে যাই,
কর্পুর সম উবে যায় তাহা, হাতে না লইতে তাই।
যে আমারে চাহে যতটা করিয়া আমি হই তত তার,
ইচ্ছা করিয়া আমি যে জীবনে কিছু নারি হতে কার।
যে আমারে পায় তাহার নিশীথে চির অনিদ্রা জাগে,
ফুলশয্যা যে কন্টকক্ষত তাহার জীবনে লাগে।
সাপের মাথায় চরণ রাখিয়া চলে সে আঁধার রাতে,
দুখের মুকুট মাথায় পরিয়া বিষের ভান্ড হাতে।
নিকটে করিয়া যে আমারে চাহে আমি তার বহুদূর,
দূরের বাঁশীতে বেজে ওঠে নিতি প্রীতি মিলনের সুর।

ফুলের কাহিনী স্মরিযা পতি গো, অনেক শিখেছি আজ,
স্বেচ্ছায় তাই হাসিয়া নিলাম বিরহ মেঘের বাজ।
নিকটে তোমারে পেতে চেয়েছিনু, সাধ হল না তাই,
দূরের বাঁশীরে দূরে রেখে দেখি বুকে তারে যদি পাই।
গলে না লইতে শুকাল মালিকা, মিলন রাতের মোহে,
চিরশূণ্যতা ভরেছি এ বুকে দোঁহে আকড়িয়া দোঁহে।
আজ তাই পতি, বড় আশা করে তোমারে পাঠাই দূরে,
সেই শূন্যতা ভরে যদি ওঠে আমার বুকের সুরে।

আদিল কহিল, প্রাণের সকিনা, সারাটি জনম ভরে,
দুখের সাগরে সাঁতার কেটেছ কেবলি আমার তরে।
আজকে তোমার কোন সাধ হতে তোমারে না দিব বাধা,
স্বেচ্ছায় আমি বরিয়া নিলাম এই বিরহের কাঁদা।
বিদায়ের কালে বল অভাগিনী, কোথায় বাঁধিবে ঘর,
কোন ছায়াতরু শীতলিত সেই সুদূর তেপান্তর?

ম্লান হাসি হেসে কহিল সকিনা, আমার মতন হায়,
অনেক সহিয়া ঘুমায়েছে সারা জীবনে ঝড়িয়ায়;
কবর খুঁড়িয়া বাহির করিয়া তাদের কাহিনী মালা,
বক্ষে পরিয়া প্রতি পলে পলে বুঝিব তাদের জ্বালা।
যত ভাঙা ঘর শুষ্ক কুসুম, দলিত তৃষিত মন,
সেথায় আমার যোগ সাধনের রচিব যে ধানাসন।
সেইখানে পতি বরষ বরষ রহিব তপস্যায়,
খুঁজিব নতুন কথা যা শুনিলে সব দুখ দূরে যায়।
জানি না সে কোন কথা-অমৃত, কোন সে মধুর ভাষা,
তবু আজ মোর নিশিদিশি ভরি জাগিতেছে মনে আশা;
সে কথার আমি পাব সন্ধান, দুঃখ দাহন মাঝে,
হয়ত বেদন-নাশন কখন গোপনে সেখা রোজে।
একান্ত মনে বসি ধ্যানাসনে একটি একটি ধরি,
মোর ব্যথাগুলি সবার ব্যথার সঙ্গে মিশাল করি;
পরতে পরতে খুলিয়া খুলিয়া দিনের পরেতে দিন,
খুঁজিয়া দেখিব কোথা আছে সেই কথামৃতের চিন।
যদি কোন কোন সন্ধান মেলে, সে মধুর সুর নিয়া,
নতুন করিয়া গড়িব আবার আমাদের এ দুনিয়া।
সেইদিন পতি ফিরিয়া যাইব আবার তোমার ঘরে,
অভাগীরে যদি ভালবাস সখা, থেকো প্রতীক্ষা করে।

বিদায়ের আগে ও চরণে শেষ ছালাম জানায়ে যাই,
দোয়া করো মোরে, এই সাধনায় সিদ্ধি যেন গো পাই।
আর যদি কভু ফিরে নাহি আসি, ব্যথার দাহনানলে,
জানিও, অভাগী মরিয়াছে সেথা নিরাশায় জ্বলে জ্বলে।
আজি এ জীবন বিষে বিষায়িত, প্রেম, ভালবাসা, মায়া,
বেড়িয়া নাচিছে গোর কুজঝট কদাকার প্রেত ছায়া।
জ্বলিছে বহ্নি দিকে দিগনে-, তীব্র লেলিহা তার,
খোদার আরশ কুরছির পরে মূর্চ্ছিছে বারবার।
দিন রজনীর দুইটি ভান্ড পোরা যে তীব্র বিষে,
মাটির পেয়ালা পূর্ণ করিয়া উঠেছে গগন দিশে।
তারকা-চন্দ্রে জ্বলিছে তাহার তীব্র যে হুতাশন,
তারি জ্বালা হতে নিস্তার মোর না হইল কোনক্ষণ।
সন্ধ্যা সকাল তারি শিখা লয়ে আকাশের দুই কোলে,
মারণ মন্ত্র ফুকারি ফুকারি যুগল চিতা যে জ্বলে।
তাই এ জীবন সরায়ে লইনু তোমার জীবন হতে,
আমারে ভাসিতে দাও পতি, সেই কালিয়-দহের স্রোতে।



বাপের সঙ্গে চলিয়াছে ছেলে, ফিরে চায় বারে বারে,
পারিত সে যদি দুটি চোখ বরি টেনে নিয়ে যেত মারে।
পাথরের মত দাঁড়ায়ে সকিনা, স্তব্ধ যে মহাকাল,
খুঁজিয়া না পায় অভাগিনী তরে সান্ত্বনা ভাষাজাল।
চরণ হইতে চলার চক্র খসিয়া খসিয়া পড়ে,
নয়ন হইতে অশ্রুর ধারা নিশির শিশিরে ঝরে।
তিনু ফকিরের সারিন্দা বাজে, আয়রে দুষ্কু আয়,
পাতাল ফুঁড়িয়া দুনিয়া ঘুরিয়া আকাশের নিরালায়।
আয়রে দুস্কু, কবরের ঘরে হাজার বছর ঘুরে,
ছিলি অচেতন আজকে আয়রে আমার গানের সুরে।
……………………………………………..


বঙ্গ-বন্ধু  জসীমউদ্দীন

মুজিবর রহমান।
ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞঝা-অশনি বেয়ে ।
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার।
হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যে অঙ্গার ;
দিনে দিনে হয়ে বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে,
দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান ছিল প্রকাশের মুখে ;
তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি
ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি।

মুজিবর রহমান।
তব অশ্বেরে মোদের রক্তে করায়েছি পূত-স্নান।
পীড়িত-জনের নিশ্বাস তারে দিয়েছে চলার গতি,
বুলেটে নিহত শহীদেরা তার অঙ্গে দিয়েছে জ্যেতি।
দুর্ভিক্ষের দানব তাহারে অদম্য বল,
জঠরে জঠরে অনাহার-জ্বালা করে তারে চঞ্চল।
শত ক্ষতে লেখা অমর কাব্য হাসপাতালের ঘরে,
মুর্হুমুহু যে ধবনিত হইছে তোমার পথের পরে।
মায়ের বুকের ভায়ের বুকের বোনের বুকের জ্বালা,
তব সম্মুখ পথে পথে আজ দেখায়ে চলিছে আলা।
জীবন দানের প্রতিজ্ঞা লয়ে লক্ষ সেনানী পাছে,
তোমার হুকুম তামিলের লাগি সাথে তব চলিয়াছে।
রাজভয় আর কারাশৃঙ্কল হেলায় করেছ জয়।
ফাঁসির মঞ্চে-মহত্ব তব কখনো হয়নি ক্ষয়।
বাঙলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমুর্ত রাজ,
প্রতি বাঙালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ।
তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার।
অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে-স্তব্ধ হুকুমদার।

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী-জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

সেনাবাহিনীর অশ্বে চড়িয়া দম্ভ-স্ফীত ত্রাস,
কামান গোলার বুলেটের জোরে হানে বিষাক্ত শ্বাস।
তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালীর মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।

ধন্য এ কবি ধন্য এ যুগে রয়েছে জীবন লয়ে,
সম্মুখে তার মহাগৌরবে ইতিহাস চলে বয়ে।
ভুলিব না সেই মহিমার দিন, ভাষার আন্দোলনে ।
বুরেটের ভয় তুচ্ছ করিয়া ছেলেরা দাঁড়াল রণে ।
বরকত আর জব্বার আর সালাম পথের মাঝে,
পড়ে বলে গেলো, আমরা চলিনু ভাইরা আসিও পাছে।
উত্তর তার দিয়েছে বাঙালী, জানুয়ারী সত্তরে,
ঘরের বাহির হইল ছেলেরা বুলেটের মহা-ঝড়ে।
পথে পথে তারা লিখিল লেখন বুকের রক্ত দিয়ে,
লক্ষ লক্ষ ছুটিল বাঙালী সেই বাণী ফুকারিয়ে।
মরিবার সে কি উন্মাদনা যে, ভয় পালাইল ভয়ে,
পাগলের মত ছোট নর-নারী মৃত্যুরে হাতে লয়ে।
আরো একদিন ধন্য হইনু সে মহাদৃশ্য হেরি,
দিকে দিগনে- বাজিল যেদিন বাঙালীর জয়ভেরী।
মহাহুঙ্কারে কংস-কারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার,
বঙ্গ-বঙ্গ শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার।
আরো একদিন ধন্য হইব, ধন-ধান্যেতে ভরা,
জ্ঞানে-গরিমায় হাসিবে এদেশ সীমিত-বসুন্ধরা।
মাঠের পাত্রে ফসলেরা আসি ঋতুর বসনে শোভি,
বরণে সুবাসে আঁকিয়া যাইবে নকসী-কাঁথার ছবি।
মানুষ মানুষ রহিবে না ভেদ, সকলে সকলকার,
এক সাথে ভাগ করিয়া খাইবে সম্পদ যত মার।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর রুপালীর তার পরে,
পরাণ ভুলানো ভাটিয়ালী সুর বাজিবে বিশ্বভরে।
আম-কাঁঠালের ছায়ায় শীতল কুটিরগুলির তলে,
সুখ যে আসিয়া গড়াগড়ি করি খেলাইবে কুতুহলে

আরো একদিন ধন্য হইব চির-নির্ভীকভাবে,
আমাদরে জাতি নেতার পাগড়ি ধরিয়া জবাব চাবে,
কোন অধিকারে জাতির স্বার্থ করিয়াছ বিক্রয়?
আমার এদেশ হয় যেন সদা সেইরুপ নির্ভয়।


১৬ই মার্চ, ১৯৭১ সন
……………………………………………..
 
 

ফুল নেয়া ভাল নয় জসীমউদ্দীন

ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে।
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়, -
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।
যারা ফুল নিয়ে যায়,
যারা ফুল দিয়ে যায়,
তারা ভুল দিয়ে যায়,
তারা কুল নিয়ে যায়।
তুমি ফুল, মেয়ে! বাতাসে ভাঙিয়া পড়
বাতাসের ভরে দলগুলি নড়নড়।
ফুলের ভার যে পাহাড় বহিতে নারে
দখিনা বাতাস নড়ে উঠে বারে বারে।
ফুলের ভারে যে ধরণী দুলিয়া ওঠে,
ভোমর পাখার আঘাতে মাটিতে লোটে।
সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে,
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে।
……………………………………………..


আমার বাড়ি - জসীমউদ্দীন

আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।
চাঁদমুখে তোর চাঁদের চুমো
মাখিয়ে দেব সুখে
তারা ফুলের মালা গাঁথি,
জড়িয়ে দেব বুকে।
গাই দোহনের শব্দ শুনি
জেগো সকাল বেলা,
সারাটা দিন তোমায় লয়ে
করব আমি খেলা।
আমার বাড়ি ডালিম গাছে
ডালিম ফুলের হাসি,
কাজলা দীঘির কাজল জলে
কাঁসগুলি যায় ভাসি।
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
এই বরাবর পথ,
মৌরী ফুলের গন্ধ শুঁকে
থামিও তব রথ।
……………………………………………..


মামার বাড়ি - জসীমউদ্দীন

আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা,
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
মামার বাড়ি পদ্মপুকুর
গলায় গলায় জল,
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল।

দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল,
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
মামা-বাড়ির ঘর,
আকাশ হতে জোছনা-কুসুম
ঝরে মাথার পর।

রাতের বেলা জোনাক জ্বলে
বাঁশ-বাগানের ছায়,
শিমুল গাছের শাখায় বসে
ভোরের পাখি গায়।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে।
……………………………………………..

কবরজসীমউদ্দীন

এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!
সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের -পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।
এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে
ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে
বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা
আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!
হেস না­ হেস না­ শোন দাদু, সেই তামাক মাজন পেয়ে,
দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,
পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখিজলে।
আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়,
আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়
তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ
এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,
বা-জান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।
ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,
সেই শোওয়া তার শেষ শোওয়া হবে তাহা কী জানিত কেউ?
গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?
তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জঢ়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ
ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,
কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।
তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।
মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,
বড় ব্যথা , দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষী আমার ওরে,
কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।
ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন­জলে,
কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ­ব্যথার ছলে
ক্ষণপরে মোরে ডাকিয়া কহিল­ আমার কবর গায়
স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।
সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু­ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনকি­মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;
ভেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ মায়!
এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।
এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,
হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে
দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।
শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে
অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,
কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।
বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ­বীণ!
কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে
ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,
কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।
আমার বু­জীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়
হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,
রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,
অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!
ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।
বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা
একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।
সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।
কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।
আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,
দাদু! ধর­ধর­ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।
এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,
কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম­ভোলা মোর যাদু।
আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,
ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুরে,
মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে।
জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।
ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু­ব্যথিত প্রাণ
……………………………………………..


নিমন্ত্রণ জসীমউদ্দীন
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,

ছোট গাঁওখানি- ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া;
ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী
পারের খবর টানাটানি করি;
বিনাসুতি মালা গাথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া;
বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।

তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, ছোট সে কাজল গাঁয়,
গলাগলি ধরি কলা বন; যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।
সরু পথ খানি সুতায় বাঁধিয়া
দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,
বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায়,
বুকখানি তার ভরে দেবে বুঝি, মায়া আর মমতায়!

তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে নরম ঘাসের পাতে
চম্বন রাখি অধরখানিতে মেজে লয়ো নিরালাতে।
তেলাকুচা লতা গলায় পরিয়া
মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,
হেথায় সেথায় ভাব করো তুমি বুনো পাখিদের সাথে,
তোমার গায়ের রংখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।

তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তোমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।
মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া
তোর সনে দেই মিতালী করিয়া
ঢেলা কুড়িইয়া গড়ি ইমারত সারা দিনমান ধরি,
সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।

তুমি যদি যাও দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,
সীম আর সীম হাত বাড়াইলে মুঠি ভরে সেই খানে।
তুমি যদি যাও সে সব কুড়ায়ে
নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে,
খাব আর যত গেঁঢো চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে,
হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুইজনে।

তুমি যদি যাও শালুক কুড়ায়ে, খুব খুব বড় করে,
এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখনি কাহারো করে,
কারেও দেব না, তুমি যদি চাও
আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,
মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধরে,
ও পাড়াব সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর করে;

সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,
মতলব কিছু আঁটির যাহাতে খুশী তারে করা যায়!
লাল আলোয়ানে ঘুঁটে কুড়াইয়া
বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া
এত ঘুষ পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,
বলিব কালিকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।

খুব ভোর করে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,
কারেও কবি না, দেখিস্ পায়ের শব্দে কেহ না জাগে
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;
কাদার বাঁধন গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে
সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।

ভর দুপুরেতে এক রাশ কাঁদা আর এক রাশ মাছ,
কাপড়ে জড়ায়ে ফিরিয়া আসিব আপন বাড়ির কাছ।
ওরে মুখ পোড়া ওরে রে বাঁদর।
গালি ভরা মার অমনি আদর,
কতদিন আমি শুনি নারে ভাই আমার মায়ের পাছ;
যাবি তুই ভাই, আমাদের গাঁয়ে যেথা ঘন কালো গাছ।

যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
ঘন কালো বন মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।
গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
আজি সে সব সরায়ে সরায়ে খুজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গায়।

তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে ঘন-পল্লব তলে
লুকায়ে থাকিস্, খুজে যেন কেহ পায় না কোনই বলে
মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে,
হারাইয়া যাস্ পথ নাহি পেয়ে;
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমাস সন্ধ্যা হলে,
সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তোরি নাম বলে বলে।
……………………………………………..


এত হাসি কোথায় পেলেজসীমউদ্দীন
এত হাসি কোথায় পেলে
এত কথার খলখলানি
কে দিয়েছে মুখটি ভরে
কোন বা গাঙের কলকলানি।
কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে
কলমী ফুলের গুলগুলানি।
কে দিয়েছে চলন বলন
কোন সে লতার দোল দুলানী।
কাদের ঘরে রঙিন পুতুল
আদরে যে টইটুবানি।
কে এনেছে বরণ ডালায়
পাটের বনের বউটুবানী।
কাদের পাড়ার ঝামুর ঝুমুর
কাদের আদর গড়গড়ানি
কাদের দেশের কোন সে চাঁদের
জোছনা ফিনিক ফুল ছড়ানি।
তোমায় আদর করতে আমার
মন যে হলো উড়উড়ানি
উড়ে গেলাম সুরে পেলাম
ছড়ার গড়ার গড়গড়ানি।
……………………………………………..

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন